ঢাকা ০৩:৫৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo কৃষি কারিগরি কমিটির সভা অনুষ্ঠিত Logo বগুড়ায় কৃষি উদ্যোক্তাদের মাঝে রপ্তানিযোগ্য পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ যন্ত্রপাতি বিতরণ Logo জেলা কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ কমিটির সভা অনুষ্ঠিত। Logo বগুড়া অঞ্চলে বিনা উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল এবং প্রতিকূলতা সহনশীল জাত ও প্রযুক্তি পরিচিতি, উৎপাদন কৌশল ও সম্প্রসারণ শীর্ষক প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত Logo বগুড়া অঞ্চলের শস্যবিন্যাসে বিনা উদ্ভাবিত ফসলের জাত অর্ন্তভুক্তিকরণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত Logo পাবনা সদরে কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে ফসলের বীজ, সার ও চেক বিতরণ উদ্বোধন করলেন সংসদ সদস্য Logo দেশে বর্তমানে সারের সংকট নেই, মজুদও পর্যাপ্ত রয়েছে: কৃষি সচিব Logo পাবনায় ‘জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬’ এর বর্ণাঢ্য উদ্বোধন Logo রোপা আমন ধানের ব্লক প্রদর্শনীর চারা রোপণ কার্যক্রম শুরু Logo পাবনায় ০২ দিনব্যাপী কৃষি উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণের উদ্বোধন করলেন ডিএই মহাপরিচালক
পরিবর্তিত জলবায়ুতে বাংলাদেশের কৃষি

পরিবর্তিত জলবায়ুতে বাংলাদেশের কৃষি

নিজস্ব সংবাদ :
  • আপডেট সময় ০৪:৪৪:১৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬
  • / ১৯৭ বার পড়া হয়েছে

পরিবর্তিত জলবায়ুতে বাংলাদেশের কৃষি

জলবায়ুর পরিবর্তন এমন একটি বিষয় যা সামগ্রিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে প্রভাবিত করতে পারে। কৃষি, স্বাস্থ্য, শিৰা, পরিবেশ, প্রাকৃতিক সম্পদ, অবকাঠামো এবং সর্বোপরি আমাদের জীবন জীবিকার জন্য প্রয়োজনীয় যাবতীয় অবলম্বনের সব ক্ষেত্রেই জলবায়ুর সরাসরি প্রভাব রয়েছে।  যেহেতু কৃষির সূর্যের আলো, বাতাসের আর্দ্রতা এসব মৌসুমভিত্তিক পরিবর্তনের সাথে সাথে ফসলের জাত, চাষ পদ্ধতি ও উৎপাদনশীলতা নির্ধারিত হয়ে থাকে জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের সময় ও পরিমাণে তারতম্য ঘটছে এবং এর প্রভাব পড়ছে ফসলের উৎপাদনশীলতার ওপর।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যেসব দেশের ঝুঁকি বাড়বে তার মধ্যে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য। এর প্রতিক্রিয়ায় এখানে বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় বাড়বে। সাগরের উচ্চতা বাড়বে। এতে লাখো মানুষের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কৃষিতে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি
* জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে শস্যের গুণাগুণ ও উৎপাদনের পরিমাণে পরিবর্তন আসবে। বর্তমান চাষ এলাকায় উৎপাদন হ্রাস পাবে।
* পানির স্বল্পতা ঘটবে ও মাটির উর্বরতা কমে যাবে।
* নতুন নতুন বালাই দেখা দিতে পারে। কৃষিতে কীটনাশক ও সারের প্রয়োগ বাড়াতে হবে।
* সেচের ব্যাপকতা, ভূমিক্ষয় শস্য বৈচিত্র্য কমে যাওয়া, রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহার পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে।
* দারিদ্র্য বাড়বে এবং সমাজে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে।
* ২১ শতকে সার্বিকভাবে কৃষির উৎপাদন শতকরা ৩০ ভাগ কমে যেতে পারে।
* কিছু অঞ্চলে মৎস্য সম্পদ মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন হবে।
* ২০৫০ সন নাগাদ বাংলাদেশের ধান ও গমের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমবে।

পরিবর্তিত জলবায়ুতে বাংলাদেশের কৃষি
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং হুমকির মুখে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, বীজ গজানো, পরাগায়ন, ফুল ও ফল ধরা, পরিপক্বতার জন্য সুনির্দিষ্ট তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বৃষ্টিপাত ও সূর্যালোক প্রয়োজন। জলবায়ুর এ উপাদানগুলো পরিবর্তিত হয়েছে কিন্তু বীজ বপন ও চারা রোপণের সময় পরিবর্তন সম্ভব হয়নি। ফলে কৃষি মৌসুমের সাথে ফসল চাষাবাদ খাপ খাওয়ানো যাচ্ছে না। উষ্ণতা বাড়ার কারণে কোনো কোনো স্থানে বৃষ্টিপাত ও আর্দ্রতা বেড়ে যাচ্ছে। আর্দ্রতা এবং তাপমাত্রার সমন্বয় ছত্রাক জাতীয় রোগ বাড়িয়ে দিতে পারে। বিভিন্ন অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা, দেশের মধ্যাঞ্চলে বন্যা, বরেন্দ্র অঞ্চলের খরা এবং দৰিণাঞ্চলের লবণাক্ততা বাড়ার কারণে এদেশে ধানের উৎপাদন সন্তোষজনক না হওয়ায় খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে। বাংলাদেশের পরিবেশের ওপর প্রকাশিত টাস্কফোর্স রিপোর্ট থেকে জানা যায়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ২০৫০ সন পর্যন্ত ১ মিটার বাড়তে পারে। এর প্রভাবে ৩ হাজার মিলিয়ন হেক্টর উর্বর জমি স্থায়ীভাবে হারিয়ে যাবে, ২০০ মিলিয়ন টন, ধান, গম, আখ, পাট, মটরসহ রবিশস্য উৎপাদন কমে যাবে।

পরিবর্তিত জলবায়ুতে করণীয়
উপকূলীয় লবণাক্ত এলাকার জন্য রোপা আমন মৌসুমে বিআর ২৩, ব্রিধান-৪০ এবং ব্রিধান-৪১ এবং বোরো মৌসুম ব্রিধান-৪৭ লবণাক্ততা সহনশীল জাতের চাষ করতে হবে। এদের ফলনও ভাল। এছাড়াও অন্যান্য লোনা সহনশীল ফসলের চাষ করা যেতে পারে। বরেন্দ্র অঞ্চলে খরার কারণে ধান লাগাতে বেশি দেরি হলে নাবী ও আলোক সংবেদনশীল বিআর-২২, বিআর-২৩ ও ব্রিধান-৪৬ চাষ করে সন্তোষজনক ফলন আশা করা যায়। এছাড়া সঠিক সময়ে রোপণকৃত আমন ধান কাটার পর খরা সহনশীল ফসল যেমন-ছোলা চাষ করে জমির উৎপাদনশীলতা বাড়ানো যেতে পারে। শীত ও কুয়াশার জন্য বোরো মৌসুমে শীত সহনশীল এবং আমন মৌসুমে নাবী রোপণযোগ্য ও আলোক সংবেদনশীল জাত এবং হঠাৎ জলমগ্ন ও নদীভাঙ্গন এলাকার জন্য কিছু সময় ডুবন্ত অবস্থায় থাকতে পারে এমন জাতের চাষ করতে হবে। হাওড় অঞ্চলে আগাম বন্যা এড়ানোর জন্য স্বল্প সময়ে উৎপাদনশীল জাত যেমন ব্রিধান-২৮, ব্রিধান-৪৫ সঠিক সময়ে বপন ও রোপণ করা উচিত। কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার, কৃষি প্রযুক্তি, গুটি ইউরিয়া ও এলসিসি ব্যবহার, সুষম সার, জৈব সার, খাল পুনঃখনন, প্রিকাস্ট সেচ নালার সম্প্রসারণ, আইল ফসলের আবাদ বাসনে সর্জান পদ্ধতির ব্যবহার, রিলেক্রপিং, ইন্টারক্রপিং, বৃৰরোপণ, বৃষ্টির পানি আহরণে জলাধার নির্মাণ, কমিউনিটি পর্যায়ে সোস্যালম্যাপ প্রণয়ন করে দুর্যোগে কৃষি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে কৃষকদের সচেতনতা বৃদ্ধি ও পরিকল্পনা প্রণয়নে উপজেলা কৃষি অফিসার এর সম্পৃক্তি, আবহাওয়া অধিদপ্তরের প্রধান ও আঞ্চলিক পর্যায়ের অফিসের পুর্নগঠন Rejuvation ও কৃষি আবহাওয়ার পূর্বাভাস প্রদানের সাথে সাথে বিশেষজ্ঞদের দ্বারা পোকামাকড় ও রোগবালাই সম্পর্কে আগাম সতর্ক বার্তা প্রদান, টিস্যু কালচার পদ্ধতির সম্প্রসারণ, কৃষিভিত্তিক শিল্প স্থাপন, কৃষি পণ্যের উন্নত সংরৰণ ব্যবস্থা, শস্য বীমা চালু, অঞ্চলভিত্তিক শস্য চাষ, কৃষি ক্লিনিক, কমিউনিটি রেডিও, টেলিভিশন চ্যানেলে কৃষিভিত্তিক অনুষ্ঠানের সম্প্রচার, পোর্টল্যান্ড সিমেন্টের পরিবর্তে ইকোসিমেন্ট ব্যবহার করা যার মাধ্যমে নির্মিত বাড়িঘর বাতাস থেকে অতিরিক্ত কার্বন শোষণ করে পরিবেশকে নির্মল রাখবে, C4 উদ্ভিদের ওপর গবেষণা করে সম্প্রসারণ উপযোগী ফসলের আবাদ বৃদ্ধি।

পরিবর্তিত জলবায়ু প্রেক্ষাপটে মৎস্যখাতের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ হুমকিঃ

* সম্ভাব্য সমুদ্র স্ফীতির কারণে উপকূলীয় এলাকার শত শত একর ঘের, পুকুর ও অন্যান্য জলাশয় লোনাজলে তলিয়ে যাবার হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে।
* বৃষ্টিপাত কম হওয়ার কারণে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে ফলে নদী, নালা, খাল, বিল, হাওর, বাওর ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাচ্ছে ও মৎস্য প্রজাতির স্বাভাবিক বাসস্থান ও প্রজনন ক্ষেত্রের পরিসর কমে যাচ্ছে।
* ঝড় ও বন্যার প্রকোপ বাড়ার শত শত চাষকৃত জলাশয়ে সমুদ্রের লবনাক্ত পানি ঢুকে যাচ্ছে ফলে একদিকে যেমন চাষীরা আর্থিকভাবে ক্ষতির স্বীকার হচ্ছে অন্যদিকে জলজ জীববৈচিত্র্যের উপর ব্যাপক প্রভাব পরছে।
* স্বাদু পানির প্রাপ্যতা, বিশেষ করে বড় বড় নদী অববাহিকা কমে যাচ্ছে এবং আরও যাবে ফলে একদিকে যেমন তীব্র পানি সংকট দেখা দেবে তেমনি স্বাদুপানির মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর অবলুপ্তি ঘটবে।  

মৎস্যখাতের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ হুমকি মোকাবিলায় করণীয়ঃ
* বলা হয়ে থাকে বলা যত সহজ কিন্তু বাস্তবায়ন করা তত কঠিন। এমন একটি কঠিন বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে পরিবর্তিত জলবায়ুর হুমকি মোকাবেলায় হাত পা গুটিয়ে বসে থাকার অবকাশ নেই। প্রয়োজন কিছু একটা করার। সেই করণীয়টা কি হতে পারে তা নিচে দেয়া হল-
* গ্রীনহাউজ গ্যাস উৎসারণ এবং ক্রমবর্ধমান জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের অবদান নগন্য হলেও সম্ভাব্য সকল ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক উন্নতি ব্যাহত না করে গ্রীনহাউজ গ্যাস উৎসারণ আরও কমিয়ে আনার চেষ্টা করা করতে হবে।
* পরিবর্তিত জলবায়ুর হুমকি মোকাবিলার জন্য তৃণমূল পর্যায়ের সাধারন মানুষ যেন সহজেই পরিবর্তিত পরিবেশের সাথে নিজেকে এবং নিজের উৎপাদন গত পেশাকে মানিয়ে নিতে পারে সে বিষয়ে দক্ষতা অর্জনে সহায়তা যেমন-প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
* বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় ইত্যাদি প্রাকৃতিক দূর্যোগ মোকাবিলায় প্রাক পূর্বাভাস প্রদানে তথ্য ও বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে কমপিউটার মডেলের ব্যবহার করে আগাম সতর্ক সংকেতের সময় কাল বাড়িয়ে যথাস্থানে সহজ ভাষায় মানুষের কাছে পৌছানো হলে তৃণমূলের চাষী সহ অন্যান্য মানুষ ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনতে পারবে  ।
* পরিবর্তিত পরিবেশ উপযোগী চাষপদ্ধতির প্রচলন করতে হবে এছাড়াও লবন ও খরা সহিষ্ণু উন্নত জাতের মাছ উদ্ভাবনের কর্মসূচী হাতে নেয়া প্রয়োজন যাতে করে একদিকে যেমন মাছের উৎপাদন বাড়বে অন্যদিকে তেমনই মৎস্য প্রজাতি রক্ষায় তা গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করবে। 

আবহাওয়াজনিত সব দুর্যোগই প্রাকৃতিক। ফলে এর কোনো উপাদান বা বৈশিষ্ট্যই সহজে নিয়ন্ত্রণযোগ্য নয়। তবে উপযুক্ত পদক্ষেপ নিলে এর ক্ষতিকর প্রভাবকে কম বেশি নিয়ন্ত্রণ বা পরিহার করা যেতে পারে। দুর্যোগের সময় কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থাকে এমনভাবে বিন্যাস করতে হবে যাতে সংশ্লিষ্ট দুর্যোগের ক্ষতি পরিহার করা যায় অথবা ক্ষতির মাত্রা সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখা যায়। এ দেশের কৃষি প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করেই টিকে আছে এবং জাতির বেঁচে থাকার তাগিদেই একে উদ্ভূত সব পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্য বিধান করেই এগিয়ে যেতে হবে।

 

 

 

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপলোডকারীর তথ্য

পরিবর্তিত জলবায়ুতে বাংলাদেশের কৃষি

পরিবর্তিত জলবায়ুতে বাংলাদেশের কৃষি

আপডেট সময় ০৪:৪৪:১৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬

পরিবর্তিত জলবায়ুতে বাংলাদেশের কৃষি

জলবায়ুর পরিবর্তন এমন একটি বিষয় যা সামগ্রিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে প্রভাবিত করতে পারে। কৃষি, স্বাস্থ্য, শিৰা, পরিবেশ, প্রাকৃতিক সম্পদ, অবকাঠামো এবং সর্বোপরি আমাদের জীবন জীবিকার জন্য প্রয়োজনীয় যাবতীয় অবলম্বনের সব ক্ষেত্রেই জলবায়ুর সরাসরি প্রভাব রয়েছে।  যেহেতু কৃষির সূর্যের আলো, বাতাসের আর্দ্রতা এসব মৌসুমভিত্তিক পরিবর্তনের সাথে সাথে ফসলের জাত, চাষ পদ্ধতি ও উৎপাদনশীলতা নির্ধারিত হয়ে থাকে জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের সময় ও পরিমাণে তারতম্য ঘটছে এবং এর প্রভাব পড়ছে ফসলের উৎপাদনশীলতার ওপর।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যেসব দেশের ঝুঁকি বাড়বে তার মধ্যে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য। এর প্রতিক্রিয়ায় এখানে বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় বাড়বে। সাগরের উচ্চতা বাড়বে। এতে লাখো মানুষের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কৃষিতে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি
* জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে শস্যের গুণাগুণ ও উৎপাদনের পরিমাণে পরিবর্তন আসবে। বর্তমান চাষ এলাকায় উৎপাদন হ্রাস পাবে।
* পানির স্বল্পতা ঘটবে ও মাটির উর্বরতা কমে যাবে।
* নতুন নতুন বালাই দেখা দিতে পারে। কৃষিতে কীটনাশক ও সারের প্রয়োগ বাড়াতে হবে।
* সেচের ব্যাপকতা, ভূমিক্ষয় শস্য বৈচিত্র্য কমে যাওয়া, রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহার পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে।
* দারিদ্র্য বাড়বে এবং সমাজে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে।
* ২১ শতকে সার্বিকভাবে কৃষির উৎপাদন শতকরা ৩০ ভাগ কমে যেতে পারে।
* কিছু অঞ্চলে মৎস্য সম্পদ মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন হবে।
* ২০৫০ সন নাগাদ বাংলাদেশের ধান ও গমের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমবে।

পরিবর্তিত জলবায়ুতে বাংলাদেশের কৃষি
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং হুমকির মুখে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, বীজ গজানো, পরাগায়ন, ফুল ও ফল ধরা, পরিপক্বতার জন্য সুনির্দিষ্ট তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বৃষ্টিপাত ও সূর্যালোক প্রয়োজন। জলবায়ুর এ উপাদানগুলো পরিবর্তিত হয়েছে কিন্তু বীজ বপন ও চারা রোপণের সময় পরিবর্তন সম্ভব হয়নি। ফলে কৃষি মৌসুমের সাথে ফসল চাষাবাদ খাপ খাওয়ানো যাচ্ছে না। উষ্ণতা বাড়ার কারণে কোনো কোনো স্থানে বৃষ্টিপাত ও আর্দ্রতা বেড়ে যাচ্ছে। আর্দ্রতা এবং তাপমাত্রার সমন্বয় ছত্রাক জাতীয় রোগ বাড়িয়ে দিতে পারে। বিভিন্ন অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা, দেশের মধ্যাঞ্চলে বন্যা, বরেন্দ্র অঞ্চলের খরা এবং দৰিণাঞ্চলের লবণাক্ততা বাড়ার কারণে এদেশে ধানের উৎপাদন সন্তোষজনক না হওয়ায় খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে। বাংলাদেশের পরিবেশের ওপর প্রকাশিত টাস্কফোর্স রিপোর্ট থেকে জানা যায়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ২০৫০ সন পর্যন্ত ১ মিটার বাড়তে পারে। এর প্রভাবে ৩ হাজার মিলিয়ন হেক্টর উর্বর জমি স্থায়ীভাবে হারিয়ে যাবে, ২০০ মিলিয়ন টন, ধান, গম, আখ, পাট, মটরসহ রবিশস্য উৎপাদন কমে যাবে।

পরিবর্তিত জলবায়ুতে করণীয়
উপকূলীয় লবণাক্ত এলাকার জন্য রোপা আমন মৌসুমে বিআর ২৩, ব্রিধান-৪০ এবং ব্রিধান-৪১ এবং বোরো মৌসুম ব্রিধান-৪৭ লবণাক্ততা সহনশীল জাতের চাষ করতে হবে। এদের ফলনও ভাল। এছাড়াও অন্যান্য লোনা সহনশীল ফসলের চাষ করা যেতে পারে। বরেন্দ্র অঞ্চলে খরার কারণে ধান লাগাতে বেশি দেরি হলে নাবী ও আলোক সংবেদনশীল বিআর-২২, বিআর-২৩ ও ব্রিধান-৪৬ চাষ করে সন্তোষজনক ফলন আশা করা যায়। এছাড়া সঠিক সময়ে রোপণকৃত আমন ধান কাটার পর খরা সহনশীল ফসল যেমন-ছোলা চাষ করে জমির উৎপাদনশীলতা বাড়ানো যেতে পারে। শীত ও কুয়াশার জন্য বোরো মৌসুমে শীত সহনশীল এবং আমন মৌসুমে নাবী রোপণযোগ্য ও আলোক সংবেদনশীল জাত এবং হঠাৎ জলমগ্ন ও নদীভাঙ্গন এলাকার জন্য কিছু সময় ডুবন্ত অবস্থায় থাকতে পারে এমন জাতের চাষ করতে হবে। হাওড় অঞ্চলে আগাম বন্যা এড়ানোর জন্য স্বল্প সময়ে উৎপাদনশীল জাত যেমন ব্রিধান-২৮, ব্রিধান-৪৫ সঠিক সময়ে বপন ও রোপণ করা উচিত। কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার, কৃষি প্রযুক্তি, গুটি ইউরিয়া ও এলসিসি ব্যবহার, সুষম সার, জৈব সার, খাল পুনঃখনন, প্রিকাস্ট সেচ নালার সম্প্রসারণ, আইল ফসলের আবাদ বাসনে সর্জান পদ্ধতির ব্যবহার, রিলেক্রপিং, ইন্টারক্রপিং, বৃৰরোপণ, বৃষ্টির পানি আহরণে জলাধার নির্মাণ, কমিউনিটি পর্যায়ে সোস্যালম্যাপ প্রণয়ন করে দুর্যোগে কৃষি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে কৃষকদের সচেতনতা বৃদ্ধি ও পরিকল্পনা প্রণয়নে উপজেলা কৃষি অফিসার এর সম্পৃক্তি, আবহাওয়া অধিদপ্তরের প্রধান ও আঞ্চলিক পর্যায়ের অফিসের পুর্নগঠন Rejuvation ও কৃষি আবহাওয়ার পূর্বাভাস প্রদানের সাথে সাথে বিশেষজ্ঞদের দ্বারা পোকামাকড় ও রোগবালাই সম্পর্কে আগাম সতর্ক বার্তা প্রদান, টিস্যু কালচার পদ্ধতির সম্প্রসারণ, কৃষিভিত্তিক শিল্প স্থাপন, কৃষি পণ্যের উন্নত সংরৰণ ব্যবস্থা, শস্য বীমা চালু, অঞ্চলভিত্তিক শস্য চাষ, কৃষি ক্লিনিক, কমিউনিটি রেডিও, টেলিভিশন চ্যানেলে কৃষিভিত্তিক অনুষ্ঠানের সম্প্রচার, পোর্টল্যান্ড সিমেন্টের পরিবর্তে ইকোসিমেন্ট ব্যবহার করা যার মাধ্যমে নির্মিত বাড়িঘর বাতাস থেকে অতিরিক্ত কার্বন শোষণ করে পরিবেশকে নির্মল রাখবে, C4 উদ্ভিদের ওপর গবেষণা করে সম্প্রসারণ উপযোগী ফসলের আবাদ বৃদ্ধি।

পরিবর্তিত জলবায়ু প্রেক্ষাপটে মৎস্যখাতের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ হুমকিঃ

* সম্ভাব্য সমুদ্র স্ফীতির কারণে উপকূলীয় এলাকার শত শত একর ঘের, পুকুর ও অন্যান্য জলাশয় লোনাজলে তলিয়ে যাবার হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে।
* বৃষ্টিপাত কম হওয়ার কারণে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে ফলে নদী, নালা, খাল, বিল, হাওর, বাওর ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাচ্ছে ও মৎস্য প্রজাতির স্বাভাবিক বাসস্থান ও প্রজনন ক্ষেত্রের পরিসর কমে যাচ্ছে।
* ঝড় ও বন্যার প্রকোপ বাড়ার শত শত চাষকৃত জলাশয়ে সমুদ্রের লবনাক্ত পানি ঢুকে যাচ্ছে ফলে একদিকে যেমন চাষীরা আর্থিকভাবে ক্ষতির স্বীকার হচ্ছে অন্যদিকে জলজ জীববৈচিত্র্যের উপর ব্যাপক প্রভাব পরছে।
* স্বাদু পানির প্রাপ্যতা, বিশেষ করে বড় বড় নদী অববাহিকা কমে যাচ্ছে এবং আরও যাবে ফলে একদিকে যেমন তীব্র পানি সংকট দেখা দেবে তেমনি স্বাদুপানির মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর অবলুপ্তি ঘটবে।  

মৎস্যখাতের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ হুমকি মোকাবিলায় করণীয়ঃ
* বলা হয়ে থাকে বলা যত সহজ কিন্তু বাস্তবায়ন করা তত কঠিন। এমন একটি কঠিন বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে পরিবর্তিত জলবায়ুর হুমকি মোকাবেলায় হাত পা গুটিয়ে বসে থাকার অবকাশ নেই। প্রয়োজন কিছু একটা করার। সেই করণীয়টা কি হতে পারে তা নিচে দেয়া হল-
* গ্রীনহাউজ গ্যাস উৎসারণ এবং ক্রমবর্ধমান জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের অবদান নগন্য হলেও সম্ভাব্য সকল ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক উন্নতি ব্যাহত না করে গ্রীনহাউজ গ্যাস উৎসারণ আরও কমিয়ে আনার চেষ্টা করা করতে হবে।
* পরিবর্তিত জলবায়ুর হুমকি মোকাবিলার জন্য তৃণমূল পর্যায়ের সাধারন মানুষ যেন সহজেই পরিবর্তিত পরিবেশের সাথে নিজেকে এবং নিজের উৎপাদন গত পেশাকে মানিয়ে নিতে পারে সে বিষয়ে দক্ষতা অর্জনে সহায়তা যেমন-প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
* বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় ইত্যাদি প্রাকৃতিক দূর্যোগ মোকাবিলায় প্রাক পূর্বাভাস প্রদানে তথ্য ও বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে কমপিউটার মডেলের ব্যবহার করে আগাম সতর্ক সংকেতের সময় কাল বাড়িয়ে যথাস্থানে সহজ ভাষায় মানুষের কাছে পৌছানো হলে তৃণমূলের চাষী সহ অন্যান্য মানুষ ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনতে পারবে  ।
* পরিবর্তিত পরিবেশ উপযোগী চাষপদ্ধতির প্রচলন করতে হবে এছাড়াও লবন ও খরা সহিষ্ণু উন্নত জাতের মাছ উদ্ভাবনের কর্মসূচী হাতে নেয়া প্রয়োজন যাতে করে একদিকে যেমন মাছের উৎপাদন বাড়বে অন্যদিকে তেমনই মৎস্য প্রজাতি রক্ষায় তা গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করবে। 

আবহাওয়াজনিত সব দুর্যোগই প্রাকৃতিক। ফলে এর কোনো উপাদান বা বৈশিষ্ট্যই সহজে নিয়ন্ত্রণযোগ্য নয়। তবে উপযুক্ত পদক্ষেপ নিলে এর ক্ষতিকর প্রভাবকে কম বেশি নিয়ন্ত্রণ বা পরিহার করা যেতে পারে। দুর্যোগের সময় কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থাকে এমনভাবে বিন্যাস করতে হবে যাতে সংশ্লিষ্ট দুর্যোগের ক্ষতি পরিহার করা যায় অথবা ক্ষতির মাত্রা সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখা যায়। এ দেশের কৃষি প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করেই টিকে আছে এবং জাতির বেঁচে থাকার তাগিদেই একে উদ্ভূত সব পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্য বিধান করেই এগিয়ে যেতে হবে।