ঢাকা ০৩:৫৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo কৃষি কারিগরি কমিটির সভা অনুষ্ঠিত Logo বগুড়ায় কৃষি উদ্যোক্তাদের মাঝে রপ্তানিযোগ্য পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ যন্ত্রপাতি বিতরণ Logo জেলা কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ কমিটির সভা অনুষ্ঠিত। Logo বগুড়া অঞ্চলে বিনা উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল এবং প্রতিকূলতা সহনশীল জাত ও প্রযুক্তি পরিচিতি, উৎপাদন কৌশল ও সম্প্রসারণ শীর্ষক প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত Logo বগুড়া অঞ্চলের শস্যবিন্যাসে বিনা উদ্ভাবিত ফসলের জাত অর্ন্তভুক্তিকরণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত Logo পাবনা সদরে কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে ফসলের বীজ, সার ও চেক বিতরণ উদ্বোধন করলেন সংসদ সদস্য Logo দেশে বর্তমানে সারের সংকট নেই, মজুদও পর্যাপ্ত রয়েছে: কৃষি সচিব Logo পাবনায় ‘জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬’ এর বর্ণাঢ্য উদ্বোধন Logo রোপা আমন ধানের ব্লক প্রদর্শনীর চারা রোপণ কার্যক্রম শুরু Logo পাবনায় ০২ দিনব্যাপী কৃষি উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণের উদ্বোধন করলেন ডিএই মহাপরিচালক

মাল্টা চাষ পদ্ধতি

নিজস্ব সংবাদ :
  • আপডেট সময় ০৭:৩৫:৩৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬
  • / ১৯৬ বার পড়া হয়েছে

মিষ্টি কমলা বা Sweet orange (Citrus sinensis) সাইট্রাস পরিবারভূক্ত একটি বিদেশী ফল যা বাংলাদেশের মাল্টা নামে পরিচিত। মাল্টা খেতে খুবই সুস্বাদু এবং পুষ্টিতে ভরপুর। কমলার তুলনায় এর অভিযোজন ক্ষমতা অধিক হওয়ায় এবং এর রোগ বালাই ও পোকা মকড়ের আক্রমন কম হওয়ায় এটি বাংলাদেশের একটি সম্ভাবনাময় অর্থকরি ফসল হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে। দেশের জলবায়ু ও মাটি মাল্টা চাষের উপযোগী বিধায় পাহাড়ি এলাকা ছাড়াও দেশের অন্যান্য এলকায় সহজেই মাল্টার চাষ সম্প্রসারণ করা সম্ভব।

পুষ্টিমান ও ব্যবহার:

মাল্টা ভিটামিন ‘সি’ সমৃদ্ধ ফল। মাল্টার প্রতি 100 গ্রাম খাদ্যোপযোগী অংশে 80-60 গ্রাম পানি, 0.7-1.3 গ্রাম আমিষ, 0.1-0.3 গ্রাম চর্বি, 12.0-12.7 গ্রাম শর্করা, 0.5 গ্রাম, আঁশ 0.5-0, 7 গ্রাম ছাই, 200 আ.ইউ. ভিটামিন ‘এ’ 45-61 মিলিগ্রাম ভিটামিন ‘সি’ 0.5-2.0 গ্রাম সাইট্রিক এসডি এবং 200 কিলোজুল খাদ্যেশক্তি বিদ্যমান। বিশ্বের শতকরা 90 ভাগ অরেঞ্জ জুস মালটা থেকে তৈরি করা হয়। জুস থেকে জ্যাম, জেলি, মারমালেট তৈরি করা যায়। ফলের খোসা থেকে পেকটিন, প্রসাধনী ও ঔষধ শিল্পে ব্যবহার্য অত্যাবশ্যকীয় তেল প্রস্তুত করা যায়। মাল্টা সর্দিজ্বর নিরাময়ে উপকারী।

জলবায়ু ও মাটি: কম বৃষ্টিবহুল সুনির্দিষ্ট গ্রীষ্ম ও শীতকাল বৃষ্টি শুষ্ক ও উষ্ণ জলবায়ু মাল্টা চাষের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। অতিবৃষ্টিতে ফল বেশি রসালো হয়। এছাড়া খোসা পাতলার পাশাপাশি গুণগতমান নিম্ন হয় ও রোগ-পোকার আক্রমন বেড়ে যায়। তবে শুষ্ক আবহাওয়া ফলের স্বাদ ও মানকে করে উন্নত। মাল্টা প্রায় সব ধরনের মাটিতে জন্মে। তবে ছায়া পরে না এমন সুনিষ্কাশিত উর্বর, মধ্যম হতে হালকা দোঁআশ  মাটি চাষের জন্য সবচেয়ে ভালো। মধ্য অম্ল থেকো সামান্য ক্ষারীয় মাটিতে অর্থৎ 5,5-6.5 অম্লতায় মাল্টা ভাল জন্মে। মাল্টাগাছ লবনাক্ততা ও উচ্চ তাপমাত্রা সংবেদনশীল এবং জলাব্ধতার সহ্য করতে পারে না।

জাত:

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ‘বারি মাল্টা-1’ নামে 2003 সালে মাল্টার একটি উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছে। এ জাতের পাকা ফল দেখতে আকর্ষনীয় সবুজ এবং খেতে সুস্বাদু ও মিষ্টি। জাতটি নিয়মিত ফলদানকারী এবং উচ্চফলনশীল। ফল গোলাকার, মাঝারি আকৃতির (150 গ্রাম)। ফলের পুষ্প প্রান্তে পয়সা সাদৃশ সামান্য নিচু বৃত্ত বিদ্যমান। গাছ প্রতি 300-400 টি ফল ধরে। হেক্টর প্রতি ফলন 20 টন। দেশের সব অঞ্চলে চাষের জন্য এ জাতটি উপযোগী। এছাড়া বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় একটি জাত উদ্ভাবন করেছে। নাম এফটিআইপি বাউ মাল্টা-1। প্রতিটি ফলের ওজন 170 হতে 200 গ্রাম। গাছ বামনাকৃতি, বিচি কম হয়। মার্চ-এপ্র্রিল মাসে ফুল আসে। সেপ্টেম্বনর-অক্টোবরে ফল পাকে।

বংশবিস্তার:

বীজ ও কলমের মাধ্যমে মাল্টার বংশবিস্তার করা যায়। কলমের মাধ্যমে চারা তৈরি করাই উত্তম। কলমের মাধ্যমে চার উৎপাদন করলে সেটার মাতৃ গুণাগুনও ঠিক থাকে এবং দ্রুত ফল ধরে। এছাড়া রোগ প্রতিরোধী ও বলিষ্ট শিকড় সমৃদ্ধ আদিজোড়ের উপর কলম করার ফলে গাছের  জীবনকাল, অভিযোজন, রোগ প্রতিরোধ ও উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। নির্বাচিত মাতৃগাছ হতে সায়ন সংগ্রহ করে এবংআদিজোড় হিসেবে বাতাবিলেবু, রাফলেমন, কাটা জামির, রংপুর লাইম প্রভূতি ব্যবহার করে গ্রাফটিং পদ্ধতিতে উন্নতমানের চারা তৈরি করা যায়।

জমি নির্বাচন ও তৈরি:

সারাদিন রোদ পড়ে এবং বৃষ্টির পানি জমেনা এমন উঁচু বা মাঝারী উঁচু জমি মাল্টা চাষের জন্য নির্বাচন করতে হবে। নির্বাচিত জমিতে পর্যায়ক্রমিক চাষ ও মই দিয়ে সমান করে নিতে হবে। জমি থেকে আগাছা পরিষ্কার করতে হবে এবং আশে পাশে উঁচু জমি মাল্টা চাষের জন্য নির্বাচন রেতে হবে। নির্বাচিত জমিটি পর্যায়ক্রমে চাষ ও মই দিয়ে সমান করে নিতে হবে। জমি থেকে আগাছা পরিষ্কার করতে হবে এবং আশে পাশে উঁচু গাছ থাকলে তার ডালপালা ছেঁটে দিতে হবে।

রোপন পদ্ধতি ও সময়:

সমতল বর্গাকার বা ষড়ভূজী পদ্ধাতিতে এবং পাহাড়ি এলকায় কন্টার পদ্ধাতিতে চারা/কলম রোপণ করা হয়। সাধারণ মধ্য

বৈশাখ থেকে মধ্য ভাদ্র (মে-আগস্ট) মাসের মধ্যে মাল্টা চারা লাগানো উত্তম। চারা রোপণের 15-20 দিন পূর্বে উভয় দিকে 4 মিটার দূরত্বে 75 সে.মি. ×75সে.মি.  ×75সে.মি.   মাপের গর্ত করতে হবে। প্রতি গর্তে 15 কেজি কম্পোস্ট বা পঁচা গোবর, 3-5 কেজি ছাই, 250 গ্রাম টিএসপি, 250 গ্রাম এমওপি সার এবং 250 গ্রাম চুন গর্তে উপরের মাটির সাথে ভালভাবে মিশিয়ে গর্ত  ভরাট করতে হবে। গর্ত ভারাট করার 10-15 দিন পর গর্তের মাঝখানে সোজাভাবে চারা রোপণ করতে হবে। রোপণের পরপর খুটি দিয়ে চারা/কলমটি খুটির সাথে বেঁধে দিতে হবে। অত:পর প্রয়োজনমত পানি সেচ ও বেড়ার ব্যবস্থা করত হবে।

সার প্রয়োগ:

গাছের যথাযথ বৃদ্ধির জন্য সময়মত, সঠিক পরিমাণে এবং সঠিক পদ্ধতিতে সার প্রয়োগ করতে হবে। গাছের বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে সারের পরিমাণ বাড়াতে হবে। বয়স ভেদে গাছ প্রতি সারের পরিমাণ নিম্নে দেওয়া হল:

গাছের বয়স (বছর)গোবর সার (কেজি)ইউরিয়া (গ্রাম)টিএসপি (গ্রাম)এমওপি (গ্রাম)জিংক অক্সাইড (গ্রাম)বরিক এসিড (গ্রাম)
1-2 3-4 5-47 8-10 10+10-12 12-15 15-18 18-20 20-25200-300 300-450 450-600 600-700 750100-150 150-200 200-300 300-450 500100-150 150-200 200-250 250-300 45010 15 20 25 305 8 10 12 15

বৈশাখ থেকে মধ্য জ্যৈষ্ঠ (মে) এবং বর্ষার পর মধ্য ভাদ্র থেকে মধ্য আশ্বিন (সেপ্টেম্বর) মাসে তিন কিস্তিতে সার প্রয়োগ করা যেতে পারে। তবে সেচের ব্যবস্থা না থাকলে বর্ষার আগে ও পরে দুই কিস্তিতে সার প্রয়োগ করলে ভাল। দুপুরবেলা মাটিতে গাছের ছায়া যতটুকু পড়ে ততোটুকু স্থানে 6 ইঞ্চি গভীর করে ভালোভাবে কুপিয়ে সার দেয়া উত্তম অথবা গাছের গোড়া হতে 1 ফুট বাদ দিয়ে এরপর 4 ফুট পরিমাণ জমি বৃত্তাকারে অনুরূপ ভাবে কুপিয়ে দিলেও হবে। পাবর্ত্য এলকায় অতি বৃষ্টিতে মাটির খাদ্য উপাদান অধিক পরিমানে চুইয়ে নষ্ট হয় বিধায় গাছে প্রতিমাসে কিছু কিছু সার দিলে ফল ঝরা কমে যায় ও ফলের আকার ও পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।

আগাছা পরিষ্কার:

বাগান সবসময় আগাছামুক্ত রাখতে হবে। গাছের গোড়া হতে একটু দূরে শুকনো লতাপাতা , খড়, কুটা বিছিয়ে বা কালো পলিথিন দিয়ে মালচিং এর ব্যবস্থা করলে ভালো হয়। এতে আগাছা জন্মাবে না এবং মাটির আর্দ্রতা বজায় থাকবে।

সেচ ও নিষ্কাশন:

শীত মৌসুমে এবং অন্য সময় খরা দেখা দিলে গাছের গোড়ায় পানি দিতে হবে। তেমনি বর্ষার পানিতে জলাবদ্ধতা যেন না হয়, সেজন্য দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে।

ফল পাতলাকরণ:

কোনো কোনো কলমের গাছে প্রথম বছরে ফল আসতে পারে। তবে পরপর দু’বছর ফুল ভেঙ্গে দেয়া উত্তম। এতে গাছের কান্ড মোটা হয় ও গাছ বড় হওয়ার সুযোগ পায়। ফলের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। পরিণত বয়সে প্রতিটি গাছে প্রচুর পরিমাণে ফল ধরে। পুরো ফল রাখা হলে এর আকার ও গুণগতমান হ্রাস পায়। তাই প্রতি বোঁটায় দুটি ফল রেখে অবশিষ্ট ফল ছোট (মার্বেল আকৃতি) অবস্থায় ছিড়ে ফেলতে হবে। এর ফলে বাকী ফলগুলোর আকার বড় হবে ও আকর্ষণীয় হবে।

ফলের ব্যাগিং:

বিশেষ ধরনের কাগজের তৈরি ব্যাগ দিয়ে ফল ব্যাগিং করলে ক্ষতিকর পোকা মাকড়ের আক্রমণ হয় না। ফল আকর্ষনীয় হলে বেশি মূল্য পাওয়া যায়। তাই ফল পরিপক্কতার পূর্বেই ছত্রাকনাশক (টিল্ট 250 ইসি 0.5 মিলিটলটার/1 লিটার) প্রয়োগ করে  করে ব্যাগিং করতে হবে। এ ব্যাগ দু-তিন বছর ব্যবহার করা যায়। দেশীয় পদ্ধতিতে পলিথিন, কাপড় কিংবা বাটার পেপার দিয়ে ব্যবহার করা যেতে পারে।

বালাই ব্যবস্থাপনা:

মাল্টা ফসলে বিণিন্ন ধরনের পোকামাকড় এবং রোগের আক্রমণ হতে পারে ।

পাতা সুড়ঙ্গকারি পোকা:

লিফ মাইনার বা পাতা সুড়ঙ্গকারি পোকা মাল্টার অন্যতম একটি ক্ষতিকর পোকা। সাধারণ গ্রীষ্ম ও শরৎকালে গাছে নতুন পাতা গজালে এ পোকার আক্রমণ লক্ষ করা যায়। এ পোকার কীড়াগুলো পাতার উপত্বকের ঠিক নিচের সুবুজ অংশ খেয়ে আকা বাঁকা সুড়ঙ্গের মত সৃরঙ্গের সৃষ্টি করে। আক্রমণের মাত্রা তীব্র হলে গাছের পাতা কুঁকড়ে যায় ও বিবর্ণ হয়ে শুকিয়ে পড়ে। গাছ দুর্বল হয়ে যায় ও গাছের বৃদ্ধি ব্যহত হয়। এ পোকা নিয়ন্ত্রণে প্রাথমিক অবস্থায় লার্ভাসহ আক্রান্ত পাতা সংগ্রহ করে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। আঠালো হলুদ ফাঁদ ব্যবহার করা যায়। কচি পাতায় এডমায়ার 200 এসএল 0.25 মি.লি. বা কিনালাক্স 25 ইসি 2 মি.লি. প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে 10-15 দিন পর পর 3-4 বার গাছে স্প্রে করতে হবে।

ফলের মাছি পোকা: পূর্ণাঙ্গ পোকা সাধারণ আধা পাকা ফলের ভিতরে ডিম পারে। ডিম ফুটে কীড়া বের হয়ে ফলের  খেতে থাকে। পরবর্তী সময়ে আক্রান্ত ফলে ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া জন্মে ও আক্রান্ত ফল পঁচে ঝরে পড়ে। এর প্রতিকারে আক্রান্ত ফল সংগ্রহ করে পুড়িয়ে ফেলতে হবে বা মাটির গভীরে পুতে ফেলতে হবে। সেক্স-ফেরোমন ফাঁদ দ্বারা পূর্ণঙ্গ পুরুষ পোকা মারা যেতে পারে। আগস্ট মাস থেকে ফল সংগ্রাহের পূর্ব পর্যন্ত বাগানে 10 মিটার অন্তর এ ফাঁদ ব্যবহার করতে হবে।

লেবুর প্রজাপতি পোকা:

পুর্ণাঙ্গ পোকা কাল হলুদ রঙের এক ধররেন প্রজাপতি বিশেষ। এদের কীড়াগুলি পাতা খেয়ে গাছের ব্যপক ক্ষতি সাধন করে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ করতে হবে। আক্রমণ বেশি হলে কঁচি পাতায় ডাইমেক্রন 100 ইসি বা সুমিথয়ন 2 মি:লি:/লিটার পানি অথবা সেভিন 85 এসসি 1 গ্রাম/লিটার পানির সাথে মিশিয়ে 10-15 দিন পর পর 3-4 বার গাছ স্প্রে করতে হবে।

ড্যাম্পিং অফ রোগ: মাল্টার নার্সারির জন্য এটি একটি মারাত্বক রোগ। এ রোগের আক্রমণে চারার গোড়ায় দিকে পঁচে যায় এবং চারা মরে যায়। বর্ষা মৌসুমে এ রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি হয়। বাণিজ্যিক নার্সারির বীজতলা ফরমালডিহাইড দিয়ে শোধন করতে হবে। বীজ বপনেরপূর্বে এগ্রোসিন দ্বারা বীজ শোধন করতে হবে। বীজতলায় প্রয়োজনের অতিরিক্ত সেচ দেয়া যাবে না এবং দ্রুত পানি নিকাশের ব্যবস্থা করতে হবে। রোগ দেখা মাত্র রিডোমিল গোল্ড 0.2% হারে প্রয়োগ করতে হবে। বীজতলায় অতিরিক্ত ঘন করে চারা লাগানো যাবে না।

ডাইব্যাক বা আগামরা রোগ:

বিভিন্ন প্রচার ছত্রাক দ্বারা এ রোগ হয়ে থাকে। আক্রান্ত গাছের পাতা ঝরে যায় ও আগা থেকে ডালপালা শুকেয় নীচের  দিকে আসতে থাকে এবং আস্তে আস্তে পুরো গাছটিই মরে যায়। মরা ডাল 2.5 সে.মি সবুজ অংশ সহ কেটে ফেলে এবং কর্তিত অংশে বর্দ্দোপেস্ট লাগাতে হবে। বছরে দু’ একবার গাছে বর্দ্দোমিশ্রন অথবা কুপ্রাভিট/কপার অক্সিক্লোরাইডি প্রতি লিটার পানিতে 2 গ্রাম হারে মিশিয়ে স্প্রে করা প্রয়োজন।

গ্রিনিং রোগ: কমলা ও মাল্টা জাতীয় গাছের একটি মারাত্বক রোগ। সাধারণত রোগাক্রান্ত গাছের পাতা হলদেভাব ধারন করে দেখলে মনে হয় যেন এটি দস্তা অভাব জনিত লক্ষণ। পাতার শিরা দুর্বল হওয়া, পাতা কিছু কোকড়ানো ওপাতার সংখ্যা কমে আসা, গাছ ওপর থেকে নিচের দিকে মরতে থাকা ও ফলের সংখ্যা কমে যাওয়া হলো এ রোগের  প্রধান লক্ষণ। এ রোগ সাইলিড নামক এক প্রকার পোকা দ্বারা সংক্রামিত হয়। তাছাড়া রোগাক্রান্ত গাছ থেকে ডাল নিয়ে জোড় কলম, শাখা কলম বা গুটি কলম করার নতুন গাছ এ রোগ দেখা দেয়। মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত প্রতি মাসে একবার কীটনাশক ঔষধ (ম্যালাথিয়ন/ডাইমেক্রন/ডেসিস) প্রয়োগ করে এ রোগ কিস্তারকারী পোকা সাইলিড ব্যাগ দমন করতে হবে। আক্রান্ত গাছ উঠিয়ে পুড়িয়ে ফেলতে হবে।

গামোসিস:

ফাইটোফথোরা নামক ছত্রাকের আক্রমণে এ রোগ হয়। আক্রান্ত ডালে লম্বা লম্বি ফাঠল দেখা দেয় এবং ফাটল থেকে আঠা বের হতে থাকে । আক্রান্ত ডালের পাতা হলুদ হয়ে যায় এবং ডাল উপরদিকে থেকে মরতে থাকে। কান্ড বা ডালের সম্পূর্ণ বাকল রিং আকারে নষ্ট হয়ে গাছ মারা যায়। গাছের শিকড় ও গোড়ায় বাকল কর্তণ জনিত কারণে ক্ষতের সৃষ্টি হলে ক্ষত স্থানে  ভিতর দিয়ে এ রোগের  জীবাণু প্রবেশ করে।  রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন আদিজোড়/রুট স্টক যেমন রংপুর লাইম, রাফ লেমন, ক্লিওপেট্রা ম্যান্ডারিন, কাটা জামির ব্যবহার করতে হবে। পানি নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা করা এবং গাছকে সবল ও সতেজ রাখতে হবে। প্রাথমিক অবস্থায় ডালের আক্রান্ত অংশে চাকু দিয়ে চেঁছে পরিষ্কার করে বর্দ্দোপেস্ট লাগাতে হবে।

ফল সংগ্রহ ও সংগ্রহোত্তর পরিচর্যা:

ফল পূর্ণতা প্রাপ্তির সাথে সাথে ফরের গাড় সবুজ বর্ণ হালকা সবুজ বা ফ্যাকাশে সবুজ হতে থাকে । বারি মাল্টা-1 সেপ্টেম্বর অক্টোর মাসে আহরণ করা হয়। পরিপক্ক ফল হাত অথবা জালিযুক্ত বাঁশের কোটার সাহায্যে সংগ্রহ করা হয়। ফল সংগ্রহের পর আঘাতপ্রাপ্ত ও নষ্ট হওয়া ফলগুলো আলাদ করতে হবে। ভাল মানের ফলগুলো প্রয়োজনে গ্রেডিং করে পরিষ্কার কাপড় দিয়ে মুছে ঠান্ড জায়গায় সংরক্ষণ করতে হবে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপলোডকারীর তথ্য

মাল্টা চাষ পদ্ধতি

আপডেট সময় ০৭:৩৫:৩৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬

মিষ্টি কমলা বা Sweet orange (Citrus sinensis) সাইট্রাস পরিবারভূক্ত একটি বিদেশী ফল যা বাংলাদেশের মাল্টা নামে পরিচিত। মাল্টা খেতে খুবই সুস্বাদু এবং পুষ্টিতে ভরপুর। কমলার তুলনায় এর অভিযোজন ক্ষমতা অধিক হওয়ায় এবং এর রোগ বালাই ও পোকা মকড়ের আক্রমন কম হওয়ায় এটি বাংলাদেশের একটি সম্ভাবনাময় অর্থকরি ফসল হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে। দেশের জলবায়ু ও মাটি মাল্টা চাষের উপযোগী বিধায় পাহাড়ি এলাকা ছাড়াও দেশের অন্যান্য এলকায় সহজেই মাল্টার চাষ সম্প্রসারণ করা সম্ভব।

পুষ্টিমান ও ব্যবহার:

মাল্টা ভিটামিন ‘সি’ সমৃদ্ধ ফল। মাল্টার প্রতি 100 গ্রাম খাদ্যোপযোগী অংশে 80-60 গ্রাম পানি, 0.7-1.3 গ্রাম আমিষ, 0.1-0.3 গ্রাম চর্বি, 12.0-12.7 গ্রাম শর্করা, 0.5 গ্রাম, আঁশ 0.5-0, 7 গ্রাম ছাই, 200 আ.ইউ. ভিটামিন ‘এ’ 45-61 মিলিগ্রাম ভিটামিন ‘সি’ 0.5-2.0 গ্রাম সাইট্রিক এসডি এবং 200 কিলোজুল খাদ্যেশক্তি বিদ্যমান। বিশ্বের শতকরা 90 ভাগ অরেঞ্জ জুস মালটা থেকে তৈরি করা হয়। জুস থেকে জ্যাম, জেলি, মারমালেট তৈরি করা যায়। ফলের খোসা থেকে পেকটিন, প্রসাধনী ও ঔষধ শিল্পে ব্যবহার্য অত্যাবশ্যকীয় তেল প্রস্তুত করা যায়। মাল্টা সর্দিজ্বর নিরাময়ে উপকারী।

জলবায়ু ও মাটি: কম বৃষ্টিবহুল সুনির্দিষ্ট গ্রীষ্ম ও শীতকাল বৃষ্টি শুষ্ক ও উষ্ণ জলবায়ু মাল্টা চাষের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। অতিবৃষ্টিতে ফল বেশি রসালো হয়। এছাড়া খোসা পাতলার পাশাপাশি গুণগতমান নিম্ন হয় ও রোগ-পোকার আক্রমন বেড়ে যায়। তবে শুষ্ক আবহাওয়া ফলের স্বাদ ও মানকে করে উন্নত। মাল্টা প্রায় সব ধরনের মাটিতে জন্মে। তবে ছায়া পরে না এমন সুনিষ্কাশিত উর্বর, মধ্যম হতে হালকা দোঁআশ  মাটি চাষের জন্য সবচেয়ে ভালো। মধ্য অম্ল থেকো সামান্য ক্ষারীয় মাটিতে অর্থৎ 5,5-6.5 অম্লতায় মাল্টা ভাল জন্মে। মাল্টাগাছ লবনাক্ততা ও উচ্চ তাপমাত্রা সংবেদনশীল এবং জলাব্ধতার সহ্য করতে পারে না।

জাত:

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ‘বারি মাল্টা-1’ নামে 2003 সালে মাল্টার একটি উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছে। এ জাতের পাকা ফল দেখতে আকর্ষনীয় সবুজ এবং খেতে সুস্বাদু ও মিষ্টি। জাতটি নিয়মিত ফলদানকারী এবং উচ্চফলনশীল। ফল গোলাকার, মাঝারি আকৃতির (150 গ্রাম)। ফলের পুষ্প প্রান্তে পয়সা সাদৃশ সামান্য নিচু বৃত্ত বিদ্যমান। গাছ প্রতি 300-400 টি ফল ধরে। হেক্টর প্রতি ফলন 20 টন। দেশের সব অঞ্চলে চাষের জন্য এ জাতটি উপযোগী। এছাড়া বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় একটি জাত উদ্ভাবন করেছে। নাম এফটিআইপি বাউ মাল্টা-1। প্রতিটি ফলের ওজন 170 হতে 200 গ্রাম। গাছ বামনাকৃতি, বিচি কম হয়। মার্চ-এপ্র্রিল মাসে ফুল আসে। সেপ্টেম্বনর-অক্টোবরে ফল পাকে।

বংশবিস্তার:

বীজ ও কলমের মাধ্যমে মাল্টার বংশবিস্তার করা যায়। কলমের মাধ্যমে চারা তৈরি করাই উত্তম। কলমের মাধ্যমে চার উৎপাদন করলে সেটার মাতৃ গুণাগুনও ঠিক থাকে এবং দ্রুত ফল ধরে। এছাড়া রোগ প্রতিরোধী ও বলিষ্ট শিকড় সমৃদ্ধ আদিজোড়ের উপর কলম করার ফলে গাছের  জীবনকাল, অভিযোজন, রোগ প্রতিরোধ ও উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। নির্বাচিত মাতৃগাছ হতে সায়ন সংগ্রহ করে এবংআদিজোড় হিসেবে বাতাবিলেবু, রাফলেমন, কাটা জামির, রংপুর লাইম প্রভূতি ব্যবহার করে গ্রাফটিং পদ্ধতিতে উন্নতমানের চারা তৈরি করা যায়।

জমি নির্বাচন ও তৈরি:

সারাদিন রোদ পড়ে এবং বৃষ্টির পানি জমেনা এমন উঁচু বা মাঝারী উঁচু জমি মাল্টা চাষের জন্য নির্বাচন করতে হবে। নির্বাচিত জমিতে পর্যায়ক্রমিক চাষ ও মই দিয়ে সমান করে নিতে হবে। জমি থেকে আগাছা পরিষ্কার করতে হবে এবং আশে পাশে উঁচু জমি মাল্টা চাষের জন্য নির্বাচন রেতে হবে। নির্বাচিত জমিটি পর্যায়ক্রমে চাষ ও মই দিয়ে সমান করে নিতে হবে। জমি থেকে আগাছা পরিষ্কার করতে হবে এবং আশে পাশে উঁচু গাছ থাকলে তার ডালপালা ছেঁটে দিতে হবে।

রোপন পদ্ধতি ও সময়:

সমতল বর্গাকার বা ষড়ভূজী পদ্ধাতিতে এবং পাহাড়ি এলকায় কন্টার পদ্ধাতিতে চারা/কলম রোপণ করা হয়। সাধারণ মধ্য

বৈশাখ থেকে মধ্য ভাদ্র (মে-আগস্ট) মাসের মধ্যে মাল্টা চারা লাগানো উত্তম। চারা রোপণের 15-20 দিন পূর্বে উভয় দিকে 4 মিটার দূরত্বে 75 সে.মি. ×75সে.মি.  ×75সে.মি.   মাপের গর্ত করতে হবে। প্রতি গর্তে 15 কেজি কম্পোস্ট বা পঁচা গোবর, 3-5 কেজি ছাই, 250 গ্রাম টিএসপি, 250 গ্রাম এমওপি সার এবং 250 গ্রাম চুন গর্তে উপরের মাটির সাথে ভালভাবে মিশিয়ে গর্ত  ভরাট করতে হবে। গর্ত ভারাট করার 10-15 দিন পর গর্তের মাঝখানে সোজাভাবে চারা রোপণ করতে হবে। রোপণের পরপর খুটি দিয়ে চারা/কলমটি খুটির সাথে বেঁধে দিতে হবে। অত:পর প্রয়োজনমত পানি সেচ ও বেড়ার ব্যবস্থা করত হবে।

সার প্রয়োগ:

গাছের যথাযথ বৃদ্ধির জন্য সময়মত, সঠিক পরিমাণে এবং সঠিক পদ্ধতিতে সার প্রয়োগ করতে হবে। গাছের বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে সারের পরিমাণ বাড়াতে হবে। বয়স ভেদে গাছ প্রতি সারের পরিমাণ নিম্নে দেওয়া হল:

গাছের বয়স (বছর)গোবর সার (কেজি)ইউরিয়া (গ্রাম)টিএসপি (গ্রাম)এমওপি (গ্রাম)জিংক অক্সাইড (গ্রাম)বরিক এসিড (গ্রাম)
1-2 3-4 5-47 8-10 10+10-12 12-15 15-18 18-20 20-25200-300 300-450 450-600 600-700 750100-150 150-200 200-300 300-450 500100-150 150-200 200-250 250-300 45010 15 20 25 305 8 10 12 15

বৈশাখ থেকে মধ্য জ্যৈষ্ঠ (মে) এবং বর্ষার পর মধ্য ভাদ্র থেকে মধ্য আশ্বিন (সেপ্টেম্বর) মাসে তিন কিস্তিতে সার প্রয়োগ করা যেতে পারে। তবে সেচের ব্যবস্থা না থাকলে বর্ষার আগে ও পরে দুই কিস্তিতে সার প্রয়োগ করলে ভাল। দুপুরবেলা মাটিতে গাছের ছায়া যতটুকু পড়ে ততোটুকু স্থানে 6 ইঞ্চি গভীর করে ভালোভাবে কুপিয়ে সার দেয়া উত্তম অথবা গাছের গোড়া হতে 1 ফুট বাদ দিয়ে এরপর 4 ফুট পরিমাণ জমি বৃত্তাকারে অনুরূপ ভাবে কুপিয়ে দিলেও হবে। পাবর্ত্য এলকায় অতি বৃষ্টিতে মাটির খাদ্য উপাদান অধিক পরিমানে চুইয়ে নষ্ট হয় বিধায় গাছে প্রতিমাসে কিছু কিছু সার দিলে ফল ঝরা কমে যায় ও ফলের আকার ও পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।

আগাছা পরিষ্কার:

বাগান সবসময় আগাছামুক্ত রাখতে হবে। গাছের গোড়া হতে একটু দূরে শুকনো লতাপাতা , খড়, কুটা বিছিয়ে বা কালো পলিথিন দিয়ে মালচিং এর ব্যবস্থা করলে ভালো হয়। এতে আগাছা জন্মাবে না এবং মাটির আর্দ্রতা বজায় থাকবে।

সেচ ও নিষ্কাশন:

শীত মৌসুমে এবং অন্য সময় খরা দেখা দিলে গাছের গোড়ায় পানি দিতে হবে। তেমনি বর্ষার পানিতে জলাবদ্ধতা যেন না হয়, সেজন্য দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে।

ফল পাতলাকরণ:

কোনো কোনো কলমের গাছে প্রথম বছরে ফল আসতে পারে। তবে পরপর দু’বছর ফুল ভেঙ্গে দেয়া উত্তম। এতে গাছের কান্ড মোটা হয় ও গাছ বড় হওয়ার সুযোগ পায়। ফলের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। পরিণত বয়সে প্রতিটি গাছে প্রচুর পরিমাণে ফল ধরে। পুরো ফল রাখা হলে এর আকার ও গুণগতমান হ্রাস পায়। তাই প্রতি বোঁটায় দুটি ফল রেখে অবশিষ্ট ফল ছোট (মার্বেল আকৃতি) অবস্থায় ছিড়ে ফেলতে হবে। এর ফলে বাকী ফলগুলোর আকার বড় হবে ও আকর্ষণীয় হবে।

ফলের ব্যাগিং:

বিশেষ ধরনের কাগজের তৈরি ব্যাগ দিয়ে ফল ব্যাগিং করলে ক্ষতিকর পোকা মাকড়ের আক্রমণ হয় না। ফল আকর্ষনীয় হলে বেশি মূল্য পাওয়া যায়। তাই ফল পরিপক্কতার পূর্বেই ছত্রাকনাশক (টিল্ট 250 ইসি 0.5 মিলিটলটার/1 লিটার) প্রয়োগ করে  করে ব্যাগিং করতে হবে। এ ব্যাগ দু-তিন বছর ব্যবহার করা যায়। দেশীয় পদ্ধতিতে পলিথিন, কাপড় কিংবা বাটার পেপার দিয়ে ব্যবহার করা যেতে পারে।

বালাই ব্যবস্থাপনা:

মাল্টা ফসলে বিণিন্ন ধরনের পোকামাকড় এবং রোগের আক্রমণ হতে পারে ।

পাতা সুড়ঙ্গকারি পোকা:

লিফ মাইনার বা পাতা সুড়ঙ্গকারি পোকা মাল্টার অন্যতম একটি ক্ষতিকর পোকা। সাধারণ গ্রীষ্ম ও শরৎকালে গাছে নতুন পাতা গজালে এ পোকার আক্রমণ লক্ষ করা যায়। এ পোকার কীড়াগুলো পাতার উপত্বকের ঠিক নিচের সুবুজ অংশ খেয়ে আকা বাঁকা সুড়ঙ্গের মত সৃরঙ্গের সৃষ্টি করে। আক্রমণের মাত্রা তীব্র হলে গাছের পাতা কুঁকড়ে যায় ও বিবর্ণ হয়ে শুকিয়ে পড়ে। গাছ দুর্বল হয়ে যায় ও গাছের বৃদ্ধি ব্যহত হয়। এ পোকা নিয়ন্ত্রণে প্রাথমিক অবস্থায় লার্ভাসহ আক্রান্ত পাতা সংগ্রহ করে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। আঠালো হলুদ ফাঁদ ব্যবহার করা যায়। কচি পাতায় এডমায়ার 200 এসএল 0.25 মি.লি. বা কিনালাক্স 25 ইসি 2 মি.লি. প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে 10-15 দিন পর পর 3-4 বার গাছে স্প্রে করতে হবে।

ফলের মাছি পোকা: পূর্ণাঙ্গ পোকা সাধারণ আধা পাকা ফলের ভিতরে ডিম পারে। ডিম ফুটে কীড়া বের হয়ে ফলের  খেতে থাকে। পরবর্তী সময়ে আক্রান্ত ফলে ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া জন্মে ও আক্রান্ত ফল পঁচে ঝরে পড়ে। এর প্রতিকারে আক্রান্ত ফল সংগ্রহ করে পুড়িয়ে ফেলতে হবে বা মাটির গভীরে পুতে ফেলতে হবে। সেক্স-ফেরোমন ফাঁদ দ্বারা পূর্ণঙ্গ পুরুষ পোকা মারা যেতে পারে। আগস্ট মাস থেকে ফল সংগ্রাহের পূর্ব পর্যন্ত বাগানে 10 মিটার অন্তর এ ফাঁদ ব্যবহার করতে হবে।

লেবুর প্রজাপতি পোকা:

পুর্ণাঙ্গ পোকা কাল হলুদ রঙের এক ধররেন প্রজাপতি বিশেষ। এদের কীড়াগুলি পাতা খেয়ে গাছের ব্যপক ক্ষতি সাধন করে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ করতে হবে। আক্রমণ বেশি হলে কঁচি পাতায় ডাইমেক্রন 100 ইসি বা সুমিথয়ন 2 মি:লি:/লিটার পানি অথবা সেভিন 85 এসসি 1 গ্রাম/লিটার পানির সাথে মিশিয়ে 10-15 দিন পর পর 3-4 বার গাছ স্প্রে করতে হবে।

ড্যাম্পিং অফ রোগ: মাল্টার নার্সারির জন্য এটি একটি মারাত্বক রোগ। এ রোগের আক্রমণে চারার গোড়ায় দিকে পঁচে যায় এবং চারা মরে যায়। বর্ষা মৌসুমে এ রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি হয়। বাণিজ্যিক নার্সারির বীজতলা ফরমালডিহাইড দিয়ে শোধন করতে হবে। বীজ বপনেরপূর্বে এগ্রোসিন দ্বারা বীজ শোধন করতে হবে। বীজতলায় প্রয়োজনের অতিরিক্ত সেচ দেয়া যাবে না এবং দ্রুত পানি নিকাশের ব্যবস্থা করতে হবে। রোগ দেখা মাত্র রিডোমিল গোল্ড 0.2% হারে প্রয়োগ করতে হবে। বীজতলায় অতিরিক্ত ঘন করে চারা লাগানো যাবে না।

ডাইব্যাক বা আগামরা রোগ:

বিভিন্ন প্রচার ছত্রাক দ্বারা এ রোগ হয়ে থাকে। আক্রান্ত গাছের পাতা ঝরে যায় ও আগা থেকে ডালপালা শুকেয় নীচের  দিকে আসতে থাকে এবং আস্তে আস্তে পুরো গাছটিই মরে যায়। মরা ডাল 2.5 সে.মি সবুজ অংশ সহ কেটে ফেলে এবং কর্তিত অংশে বর্দ্দোপেস্ট লাগাতে হবে। বছরে দু’ একবার গাছে বর্দ্দোমিশ্রন অথবা কুপ্রাভিট/কপার অক্সিক্লোরাইডি প্রতি লিটার পানিতে 2 গ্রাম হারে মিশিয়ে স্প্রে করা প্রয়োজন।

গ্রিনিং রোগ: কমলা ও মাল্টা জাতীয় গাছের একটি মারাত্বক রোগ। সাধারণত রোগাক্রান্ত গাছের পাতা হলদেভাব ধারন করে দেখলে মনে হয় যেন এটি দস্তা অভাব জনিত লক্ষণ। পাতার শিরা দুর্বল হওয়া, পাতা কিছু কোকড়ানো ওপাতার সংখ্যা কমে আসা, গাছ ওপর থেকে নিচের দিকে মরতে থাকা ও ফলের সংখ্যা কমে যাওয়া হলো এ রোগের  প্রধান লক্ষণ। এ রোগ সাইলিড নামক এক প্রকার পোকা দ্বারা সংক্রামিত হয়। তাছাড়া রোগাক্রান্ত গাছ থেকে ডাল নিয়ে জোড় কলম, শাখা কলম বা গুটি কলম করার নতুন গাছ এ রোগ দেখা দেয়। মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত প্রতি মাসে একবার কীটনাশক ঔষধ (ম্যালাথিয়ন/ডাইমেক্রন/ডেসিস) প্রয়োগ করে এ রোগ কিস্তারকারী পোকা সাইলিড ব্যাগ দমন করতে হবে। আক্রান্ত গাছ উঠিয়ে পুড়িয়ে ফেলতে হবে।

গামোসিস:

ফাইটোফথোরা নামক ছত্রাকের আক্রমণে এ রোগ হয়। আক্রান্ত ডালে লম্বা লম্বি ফাঠল দেখা দেয় এবং ফাটল থেকে আঠা বের হতে থাকে । আক্রান্ত ডালের পাতা হলুদ হয়ে যায় এবং ডাল উপরদিকে থেকে মরতে থাকে। কান্ড বা ডালের সম্পূর্ণ বাকল রিং আকারে নষ্ট হয়ে গাছ মারা যায়। গাছের শিকড় ও গোড়ায় বাকল কর্তণ জনিত কারণে ক্ষতের সৃষ্টি হলে ক্ষত স্থানে  ভিতর দিয়ে এ রোগের  জীবাণু প্রবেশ করে।  রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন আদিজোড়/রুট স্টক যেমন রংপুর লাইম, রাফ লেমন, ক্লিওপেট্রা ম্যান্ডারিন, কাটা জামির ব্যবহার করতে হবে। পানি নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা করা এবং গাছকে সবল ও সতেজ রাখতে হবে। প্রাথমিক অবস্থায় ডালের আক্রান্ত অংশে চাকু দিয়ে চেঁছে পরিষ্কার করে বর্দ্দোপেস্ট লাগাতে হবে।

ফল সংগ্রহ ও সংগ্রহোত্তর পরিচর্যা:

ফল পূর্ণতা প্রাপ্তির সাথে সাথে ফরের গাড় সবুজ বর্ণ হালকা সবুজ বা ফ্যাকাশে সবুজ হতে থাকে । বারি মাল্টা-1 সেপ্টেম্বর অক্টোর মাসে আহরণ করা হয়। পরিপক্ক ফল হাত অথবা জালিযুক্ত বাঁশের কোটার সাহায্যে সংগ্রহ করা হয়। ফল সংগ্রহের পর আঘাতপ্রাপ্ত ও নষ্ট হওয়া ফলগুলো আলাদ করতে হবে। ভাল মানের ফলগুলো প্রয়োজনে গ্রেডিং করে পরিষ্কার কাপড় দিয়ে মুছে ঠান্ড জায়গায় সংরক্ষণ করতে হবে।