লটকন এর আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি
- আপডেট সময় ০৪:২২:৩৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬
- / ১৮৭ বার পড়া হয়েছে
লটকন চাষ
লটকন আমাদের দেশের বনজঙ্গলে অযতেœ বেড়ে একটি ফল, যা অনেকের কাছে এখনও অপরিচিত। এর বৈজ্ঞানিক নাম ইধপপধঁৎবধ ংধঢ়রফধ এটি ইউফোরবিয়েসী (ঊঁঢ়যড়ৎনরধপবধব) পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। ইদানিং এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, গাজীপুর এবং নরসিংদী জেলার কয়েকটি উপজেলায় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এর চাষ শুরু হয়েছে। তবে ব্যাপক জনগোষ্টীর কাছে ফলটির পরিচয়, পুষ্টিগুণ ও চাষ প্রণালী সম্পর্কে যদি আগ্রহ বৃদ্ধি করা না যায়, তবে ফলটির চাষ সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে না। প্রতি বাড়িতে এর ২-৪ টি লটকন গাছ থাকলে পারিবারিক চাহিদা মিটিয়ে বাড়তি আয় করাও সম্ভব হবে। আশার কথা মধ্যপ্রাচ্যে ফলটির যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। কাজেই আধুনিক পদ্ধতিতে ফলটির চাষ সম্প্রসারণ করতে পারলে এই অবহেলিত ফলটিই হতে পারে আমাদের অর্থনৈতিক সম্মৃদ্ধির একটি ভাল মাধ্যম।
পরিচিতি ও জাত
লটকন বেঁটে আকারের চিরসবুজ বৃক্ষ। ফল কান্ড ও বড় বড় ডালে থোকায় থোকায় ঝুলে থাকে। একটি থোকায় ৫-৬টি থেকে ১৫-২০ টি পর্যন্ত ফল ধরে। প্রতিটি ফলের ওজন প্রায় ১২ থেকে ২০ গ্রাম । প্রতিটি ফলে ৩-৪টি কোষ থাকে। ফল কাঁচা অবস্থায় সবুজ এবং মার্বেল এর মত গোলাকার থাকে। পাকা অবস্থায় হালকা গোলাপী-হলুদ বর্ণ ধারণ করে। প্রতিটি ফলের ব্যাস হয় ৩-৪ সেন্টিমিটার। খোসার আবরণের ভিতর কোষগুলো একটি অন্যটি থেকে পাতলা কাগজের মত সাদা আবরণে পৃথক থাকে। ফলের কোষগুলো ফলের বোঁটার দিকে যুক্ত না থেকে গোড়ার দিকে যুক্ত থাকে এবং প্রতিটি কোষ পাতলা আবরনে আবৃত থাকে। ফলের কোষ কমলা লেবুর কোষের মত অর্ধ চন্দ্রাকৃতির এবং সুগন্ধযুক্ত টকমিষ্টি রসে পূর্ণ থাকে। বাংলাদেশের বাজারে দুই ধরণের লটকন পাওয়া যায়। এদের মধ্যে একটি ৩ কোষ বিশিষ্ট ছোট আকারের এবং অন্যটি ৪ কোষ বিশিষ্ট বড় আকারের। বড়টির কোষে রসের পরিমাণ এবং মিষ্টতা বেশি থাকে। চাষের জন্য ৪ কোষ বিশিষ্ট জাতটি নির্বাচন করাই উত্তম।
গাছের বৈশিষ্ট্য
লটকনের গাছ ৫-৬ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয় প্রতি গাছে প্রচুর পরিমাণে সরল পত্র থাকে। পাতাগুলো সাধারণত ১০-১২ সেন্টিমিটার লম্বা এবং ৬-৮ সেন্টিমিটার চওড়া, লটকনের পুরুষ গাছ ও স্ত্রী গাছ ভিন্ন এবং গাছের গুড়ি থেকে বসন্তকালে থোকায় থোকায় পুস্পমঞ্জরী বের হয়। তবে পুরুষ এবং স্ত্রী ফুলের পুস্পমঞ্জরী আলাদা গাছে হয় বলে একই বাগানে পুরুষ এবং স্ত্রী গাছ থাকা বাঞ্চনীয়। একক লিঙ্গের ক্ষুদ্র ফুল আলাদা গাছে থাকে তাই বাতাস এবং ক্ষুদ্র পোকামাকড় দ্বারা পরাগায়ন হয়। এভাবে পরাগায়নের পর ফলের বৃদ্ধি আরম্ভ হয়। এবং তা জুন- জুলাই পর্যন্ত চলতে থাকে। প্রতি গাছে যথেষ্ট শাখা প্রশাখা থাকে। গাছে ফল আসলে তা বাগানের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে।
ফলের পুষ্টিমান ও ঔষধিগুণ
ফল পাকা অবস্থায় হালকা গোলাপী হলদে বর্ণের হয়। ফলের কোষ খোসার দ্বারা ঢাকা থাকে। কোষের পাতলা আবরণের মধ্যে সুগন্ধযুক্ত টকমিষ্টি রস থাকে। ফলের ওজনের ৬৬% খোসা এবং বীজ এবং বাকী ৩৪% খাদ্য উপযোগী অংশ। লটকন ফলের রসে ৭২.৪% পানি থাকে।
ঔষধিগুণঃ লটকন ফল খেলে বমিবমি ভাব দূর হয়এবং পিপাসা নিবারণ হয়। শুকনো পাতার গুড়া খেলে ডায়রিয়া ও মানসিক চাপ কমে।
আবহাওয়া এবং মাটি
লটকন উষ্ণ এবং নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের আর্দ্র আবহাওয়ায় ভাল জন্মে। এ জন্য পানি দাঁড়ায় না অথচ বৃষ্টিপাত বেশি হয় এমন এলাকার বেলে -দোআঁশ, বা কাদা-দোআঁশ, ক্ষারবিহীন, সামান্য অম্লযুক্ত মাটি লটকন চাষের জন্য বেশি উপযোগী। মাটির অম্লমান ৫.৫ থেকে ৬.০ পর্যন্ত হলে ভাল হয়। এ ফলের গাছ দাঁড়ানো পানি সহ্য করতে পারে না। গাছের গোড়ায় ৮-১০ দিন পানি জমে থাকলে গাছ মরে যেতে পারে। আংশিক ছায়াযুক্ত স্থানে এ গাছ ভাল হয় বলে আম বা কাঁঠালের মত বড় গাছের নিচেও চাষ করা যায়। মধুপুর অঞ্চলের চালা জমি এ ফলের জন্য উপযুক্ত।
বংশ বিস্তার
বীজ থেকে সহজেই চারা উৎপাদন করে বংশ বিস্তার করা যায়। তবে তাতে ফলের মাতৃগুণ বজায় থাকে না। এজন্য গুটি কলমের চারা ব্যবহার করা ভাল। লটকনের বীজের আবরণ অত্যন্ত শক্ত তাই বীজ জমিতে বা পলিব্যাগে বুনার পূর্বে ১-২দিন পানিতে ভিজিয়ে নিলে চারা দ্রুত গজায়। প্রাথমিক অবস্থায় গাছের বৃদ্ধি তাড়াতাড়ি হয়। এ জন্য ১২-১৫ মাস বয়সের চারা মূল জমিতে লাগানো যায়। গুটি কলমের জন্য নির্বাচিত গাছের সুস্থ, সবল, সতেজ এবং নিরোগ ডালের মধ্যে গ্রীষ্মের প্রথম ভাগে গুটি কলম করতে হয়। আঙ্গুলের মত চিকন ও সমান্তরাল ডাল এ কাজের জন্য ব্যবহার করা উত্তম। এতে বর্ষার পূর্বেই শিকড় বের হয় এবং ডাল কেটে গুটি কলম মূল জমিতে বর্ষাকালে লাগানো যায়। বীজের গাছে ফল আসতে ৫-৬ বছর সময় লাগে কিন্তু কলমের গাছে ২-৩ বছর পর ফল ধরা শুরু হয়।
চারা লাগানো এবং যত্ব
নিষ্কাশন সুবিধাযুক্ত উঁচু বা মাঝারি উঁচু স্থানে বর্ষার পূর্বে ৩০ সে.মি. দৈর্ঘ্য, ৩০ সে.মি. প্রস্থ এবং ৩০ সে.মি. গভীর গর্ত করে তাতে ১০-১২ কেজি গোবর বা জৈব সার এবং ১.৫-২.০ কেজি ছাই ঝুরঝুরে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে গর্ত বন্ধ করে দিতে হবে এবং গর্ত বন্ধ করার ১ মাস পর কলমের বা বীজের চারা গর্তের মাটিতে লাগাতে হবে। গর্তের মাঝে চারা বসিয়ে দিয়ে তাতে বাঁশের বা গাছের ডালের ঠেকনা দিয়ে তাতে নরম পাটের বা প্লাস্টিকের সুতা দিয়ে গাছের চারাটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে দিতে হবে। প্রয়োজনে গাছের চারপাশে বাঁশের খাঁচা দিয়ে বেড়া দিতে হবে।
গাছের যত্ন
শুকনা, রোগাক্রান্ত ও দূর্বল ডালপালা ফল আহরণের পর কেটে দিতে হয়। একটি থোকায় বেশি সংখ্যক ফল থাকলে তা পাতলা করে দিলে ফল বড় হয়। ভাল ফল পাওয়ার জন্য গাছপ্রতি ০.৫ কেজি ইউরিয়া, ২৫০ গ্রাম টিএসপি এবং ৩০০ গ্রাম এমওপি সার প্রথমে ফল পাড়ার পর একবার এবং পরে বসন্তকালে ফুল আসার পূর্বে আরেকবার গাছের গোড়ার মাটি আলগা করে তাতে প্রয়োগ করতে হবে। অতিরিক্ত খরার সময় গাছের গোড়ায় রস সংরক্ষণ করার জন্য আর্বজনা দিয়ে মাটি ঢেকে দিতে হবে এবং প্রয়োজনে হালকা সেচ দিতে হবে। এতে ফলের আকার বৃদ্ধি পাবে এবং ফলন ভাল হবে।
সাথী ফসল
লটকন গাছ খুব বেশি বড় হয় না বলে এর নিচে তেমন কোন ফসলের চাষ করা যায় না, তবে অন্য বড় ফল গাছ যেমন- আম, কাঁঠাল, জাম এসব গাছের নিচে লটকন গাছ লাগানো যেতে পারে। এতে মূল গাছের ওপর তেমন কোন বিরূপ প্রতিক্রিয়া ছাড়াই জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া সম্ভব।
পোকামাকড়
লিচুর বিচিতে যে ধরনের কীড়া দেখা যায় লটকনেও একই কীড়া দেখা যায়। পূর্ণ বয়স্ক স্ত্রীমথ কচি ফলের গা চিরে চামড়ার নিচে ডিম পাড়ে, পরে চামড়ার ছিদ্র বন্ধ হয়ে যায়। ফল পাকার সময় এসব ডিম থেকে লার্ভা বের হয় এবং ফলের বীজের শাঁস খেয়ে বেঁচে থাকে, এতে ফলের মান খারাপ হয়, ফল পচে যায় এবং বাজার মূল্য কম পাওয়া যায়। গাছে কচি ফল ধরার সাথে সাথে ডিপটেরেক্র-৮০ এসপি ১.০ গ্রাম অথবা ডিপটেরেক্র-৫০ ইসি ১.৫ মিলিলিটার প্রতিলিটার পানিতে মিশিয়ে ১৫ দিন পর পর গাছে স্প্রে করতে হবে।
পাতাখেকো পোকা
কোন কোন সময় পাতার অংশ বিশেষ পাতাখেকো পোকা খেয়ে থাকে। কীটনাশক প্রয়োগের মাধ্যমে এসব পোকা নিয়ন্ত্রনে করা যায়। গাছে পোকার আক্রমণ দেখা গেলে প্রতি লিটার পানিতে কারবারিল (সেভিন/কার্বিন/অন্য নামের) ৮৫ ডব্লিউপি ২.০ গ্রাম অথবা ফেনিট্রোথিয়ন (সুমিথিয়ন/ফলিথিয়ন/অন্য নামের) ৫০ ইসি ২.০ মিলিলিটার মিশিয়ে গাছের পাতায় স্প্রে করতে হবে।
ছাতরা পোকা
ছাতরা পোকার গায়ে একধরণের সাদা পশমি আবরণ থাকে, যার জন্যে এ পোকা বাতাসে উড়তে পারে। পোকা ফলের থোকায় এবং পাতার নিচে অবস্থান করে রস চুষে খায়। এ পোকা থেকে মিষ্টি রস বের হয় বলে পোকা যেখানে অবস্থান করে তার চারপাশে কালো ধোঁয়ার মত ছত্রাকের আবরণ পড়ে। এজন্যে ফলের মান খারাপ হয়। ম্যালাথিয়ন, সেভিন, বাইড্রিন, ডায়াজিনন বা ডাইমেক্রনজাতীয় কীটনাশক স্প্রে করে এ পোকা দমন করা যায়।
রোগের প্রকোপ
কোন কোন গাছের ফলে সবুজ আবরনের উপর বাদামী দাগ পড়ে। এ ক্ষেত্রে ফল বড় হয় না এবং ফলের মান খারাপ হয় বলে বাজার মূল্য কমে যায়। রোগটি এক প্রকার ছত্রাক দ্বারা হয় তাই ডাইথেন এম-৪৫ বা রিডোমিল ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করে রোগ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। অথবা, প্রতি লিটার পানিতে ১০ গ্রাম তুঁতে ও ১০ গ্রাম চুন মিশিয়ে ১৫ দিন অন্তর স্প্রে করার মাধ্যমেও ছত্রাক রোগ দমন করা যায়। পাকা অবস্থায় ফলের নরম চামড়ার উপর প্রথমে খয়েরি দাগ দেখা দেয়। পরে সেখানে ভিজা বাদামী বর্ণের দাগ পড়ে নরম পচা রোগের বিস্তার ঘটায়। এ রোগে পচা ফলের উপর চিকন সাদা চুলের মত ছত্রাকের বিস্তৃতি দেখা যায়। ফল পাকার আগে ছত্রাকনাশক ব্যবহার করলে ফল পাড়ার পর তাড়াতাড়ি রোগের বিস্তৃতি ঘটে না। ফল পাড়ার সময় ফলের গায়ে কোন প্রকার আঘাত পেলে তার মধ্যে ছত্রাক তাড়াতাড়ি বিস্তার ঘটিয়ে রোগ সৃষ্টি করতে পারে। এ জন্য ফল সংগ্রহ অত্যন্ত সাবধানতার সঙ্গে করতে হয়। অধিক আর্দ্রতাপূর্ণ এবং অন্ধকার স্থানে ফলের ঝুড়ি রেখে দিলে এ রোগ তাড়াতাড়ি বিস্তার লাভ করে।
ফল সংগ্রহ
সাধারণত জুনের মাঝামাঝি থেকে জুলাই এর মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে ফল পাকে, তখন ফলের থোকাটি গাছ থেকে ছিঁড়ে বাঁশের ঝুড়িতে খড় বা ছালার চটের উপর রাখতে হয় যাতে ফলে কোন প্রকার আঘাত না লাগে। পরে ফলে হলুদ বর্ণ ধারণ করার জন্য ঘরের গরম স্থানে চট দিয়ে ঢেকে রেখে দিতে হবে। তাহলে ফল তাড়াতাড়ি পাকবে। ফল পাকার পর দ্রুত বাজারজাত করতে হবে, কারণ পাকা ফল ৩ দিনের বেশি সংরক্ষণ করা হলে ফলের খোসার উপরে খয়েরি দাগ পড়ে এবং তাতে বাজার মূল্য কমে যায়।
ফলন
ছোট গাছে ফল কম ধরে তবে গাছ বড় হয়ে যখন বয়স ৮-১০ বছর হয়, তখন পূর্ণমাত্রায় ফল ধরে এবং প্রায় ২৫-৩০ বছর পর্যন্ত তা চলতে থাকে। এ ক্ষেত্রে গাছপ্রতি ২০ কেজি থেকে ১০০ কেজি পর্যন্ত ফল পাওয়া যায়। বসন্তকালে গাছে ফুল ধরে তখন কুয়াশা পড়লে ফলন কমে যায়, কারণ অধিক আর্দ্রতা পরাগায়ন বিঘিœত করে। ফলের গায়ে সরাসরি রোদ লাগলে সানর্বান হয়ে মান খারাপ হয়। এ কারণে ফল পুষ্ট হলে গাছের ফল পুরাতন কাপড় দিয়ে ঢেকে দিলে ফলের রং সুন্দর হয় ও বাজারে মূল্য ভাল পাওয়া যায়।
সংরক্ষণ
ফল সংরক্ষণের কোন বৈজ্ঞানিক পন্থা এখন পর্যন্ত উদ্ভাবন করা সম্ভব হয়নি, তবে সংরক্ষণের ওপর গবেষণা করলে এ ফলটিকে লিচুর মত সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। তখন হয়তোবা লিচুর রসের মত সংরক্ষিত লটকনের রসও বাজারে পাওয়া যাবে। পাকা ফল খোসা অপসারণের পর বীজসহ হালকা লবণ প্রয়োগ করে রোদে শুকানোর পর কিছুদিন বৈয়মে সংরক্ষণ করা যায়। তার স্বাদ অনেকটা লেবুুুুুর আচারের মত লোনাযুক্ত অম্ল স্বাদের হয়ে থাকে, তাতে মরিচের গুড়া মিশালে স্বাদ বৃদ্ধি পায়।












